বাংলাদেশ ক্রিকেটের ধারাবাহিক জয়ের কারিগড় শাহরিয়ার নাফিজ

160

টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ ক্রিকেটে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, যাতে সবাই একমত। তবে ধারাবাহিক জয় কি জিনিস, তা বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে আরো ৫/৬ বৎসর। মোহাম্মদ আশরাফুল আর মাশরাফির কল্যানে ভারত, অজিদের হারিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করলেও ধারাবাহিকতার ধারে কাছেও জায়গা হয়নি আমাদের। এক জয়ের পর দীর্ঘদিন জয়খড়ায় কেটেছে।

অজিদের হারানোর পরের ম্যাচেই ইংল্যান্ডের সাথে লম্বা চুলের অধিকারী একজন ওপেনারের অভিষেক। তিনি শাহরিয়ার নাফিজ। ম্যাচে ইংল্যান্ড ৩৯১ রানের পাহাড়সম রান গড়লে বাংলাদেশ মাত্র ২২৩ রানে অলআউট হয়। নাফিজ ওপেনার হিসেবে ২৮ বলে মাত্র ১০ রান করেন। এ ম্যাচেই মোহাম্মদ আশরাফুল খেলেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বিস্ফোরক ইনিংস। ৫২ বলে ৯৪ রান করে তিনি আউট হন।

তারপর জাতীয় দলের হয়ে ২০১১ সালের পাকিস্তান ম্যাচ পর্যন্ত ৭৫টি ম্যাচ খেলে অপরাজিত ১২৩ রান বেস্টে ৪ সেঞ্চুরী ও ১৩ ফিফটিতে ২২০১ রান সংগ্রহ করেন।

২০০৫ সালেই শ্রীলংকার সাথে টেস্ট অভিষেক। ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৩ রান ও দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩ রান করে আউট হন তিনি। বাংলাদেশ দলের ব্যাটিং ব্যর্থতায় শ্রীলংকার ইনিংস ও ৯৬ রানে জয়লাভ করে।

তারপর জাতীয় দলের হয়ে ২০১৩ সালের জিম্বাবুয়ে ম্যাচ পর্যন্ত জাতীয় দলের হয়ে মাত্র ২৪টি টেস্ট খেলে ১৩৮ রান বেস্টে ১ সেঞ্চুরী ও ৭ ফিফটিতে ১২৬৭ রান সংগ্রহ করেন।

২০০৬ সালেই তাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যত অধিনায়ক হিসেবে বিবেচিত করে বাংলাদেশের অভিষেক টি২০ ম্যাচে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের প্রথম টি২০ ম্যাচে জিম্বাবুয়ের সাথে খেলতে নেমে ওপেনার হিসেবে ১৭ বলে ২৫ রানের ইনিংস খেলেন। মাশরাফির অলরাউন্ডারিং পারফরম্যান্সে বাংলাদেশ ৪৩ রানে জয়লাভ করে ম্যাচটি। ক্যারিয়ারে একটি মাত্র টি২০ ম্যাচই খেলেন নাফিজ।

ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডেতেই অজিদের সাথে ৪৭ রানের ইনিংস এবং ৪র্থ ম্যাচে অজিদের সাথে ৭৫ রানের ইনিংস খেলে নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন তিনি।

ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টে ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয় টেস্টেই শ্রীলংকার সাথে ৫১ রানের ইনিংস খেলেন। তারপর ৫ম টেস্টেই অজিদের সাথে খেলেন ১৩৮ রানের কাব্যিক ইনিংস। তখনকার সময়ের অজিদের সামনে বিশেষ করে ঘূর্ণি জাদুকর ওয়ার্নকে উইকেটশুণ্য রেখে অবলীলায় ব্যাটিং করে সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছেন নাফিজ। পরের টেস্টে আবারো খেলেন ৭৯ রানের ইনিংস।

২০০৬ সালের শুরুতে শ্রীলংকা সিরিজের পর কেনিয়ার সাথে ৯১ রান দিয়েই শুরু হয় নাফিজ ধ্বংসযজ্ঞ। যার আগুনে পুড়ে ছাই হয় অন্যদলগুলো, খাঁটি সোনা হয় বাংলাদেশ। প্রতিটি ম্যাচেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার খেলায় মেতেছিলেন তিনি। ২০০৬ সালে ৩ সেঞ্চুরী ও ৪ ফিফটিতে গড়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটে এক বৎসরে এক হাজার রানের ব্যক্তিগত রেকর্ড। যে কেনিয়া, জিম্বাবুয়ের সাথেও নিয়মিত হারতো বাংলাদেশ, তাদেরকে সিরিজের পর সিরিজ ওয়াইটওয়াশ করেছেন।

২০০৭ সালের শুরুতেও দূর্দান্ত ছিলেন তিনি। জিম্বাবুয়ের সাথে ফিফটি ও বারমুদার সাথে সেঞ্চুরী করে বছরটা ভালো শুরু করেছিলেন। কিন্তু ২০০৭ বিশ্বকাপে গিয়েই খেই হারিয়ে ফেললেন তিনি। তামিম ওপেনার হিসেবে কিছুটা সফল হলেও লাগাতর খারাপ করেন নাফিজ।

২০০৮ সালেই স্বরূপে ফিরেন তিনি। আয়ারল্যান্ড সিরিজে টানা তিন ফিফটি তথা ৯০*, ৬০ ও ৫৪ রানের ইনিংস খেলে সিরিজ সেরা হন। তৎপর পাকিস্তানের সাথে একটি ব্যর্থ সিরিজ কাটানোর পরই আইসিএল ঝড়ে ক্যারিয়ারের শক্তভীতটা নড়বড়ে করে ফেলেন তিনি। তবে নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ড সিরিজে ফিরেই দারুন শুরু করেন। প্রথম ম্যাচে ৩৫ এর পর দ্বিতীয় ম্যাচে সর্বোচ্চ ৭৩ রান খেলে দলের জয়ে ভূমিকা রাখেন। এ সিরিজেই প্রথমবারের মতো নিউজিল্যান্ড এর সাথে সিরিজ জয় ও ওয়াইটওয়াশ করে বাংলাদেশ।

২০১১ সালের বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়ে মাত্র ২টি ম্যাচ খেলেন তিনি। একটিতে ব্যর্থ হলেও নেদারল্যান্ড এর সাথে ৩৭ রানের ইনিংস খেলেন। বিশ্বকাপের পর অজিরা তিনম্যাচের সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসলে এ সিরিজেও জ্বলে উঠেন নাফিজ। প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও পরের দুই ম্যাচে ৫৬ ও ৬০ রানের দূর্দান্ত ইনিংস খেলেন।

আপাত দৃষ্টিতে অনেকেই নাফিজকে ছোট দলের বিরুদ্ধে বড় খেলোয়ার তকমা গায়ে মেখে দিলেও তিনি প্রমাণ করেছেন, তিনি সব দলের বিরুদ্ধেই খেলতে এসেছেন।

ওয়ানডে ক্রিকেটে জিম্বাবুয়ে, কেনিয়া, আয়ারল্যান্ড, বারমুদা সাথে বেশি রান করলেও অজিদের সাথেই ওয়ানডের প্রথম ফিফটি করেছেন তিনি। টেস্টেই নিজের জাত চিনিয়েছেন ভালো ভাবে। অজিদের সাথে সেঞ্চুরী সহ টেস্টের প্রতিটি ফিফটিই করেছেন বড় দলের বিরুদ্ধে।

বাংলাদেশের অন্যান্য সফল ক্রিকেটাররাও যেখানে ১৭/১৮ ইনিংস ফিফটি শুণ্য থেকেছেন সেখানে একমাত্র নাফিজই ছিলেন ব্যতিক্রম। ২/৩ ম্যাচ খারাপ করলেও পরের ম্যাচেই স্বরূপে ফিরেছেন তিনি।

আইসিএল ধাক্কার পরে জাতীয় দলের ফিরে ৯টি টেস্টে ৯৭ রান বেস্টে ৩টি ফিফটি ও প্রতিটি ম্যাচেই ২০ উর্ধ্ব ইনিংস খেলেছেন। এই সময়ে ওয়ানডেতেও ১৫টি ম্যাচ খেলে ৩টি ফিফটি করেছেন।

২০১৩ সালের শ্রীলংকা সফরে দলে থাকলেও ব্যাটের সূতা কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেই নিজের ভাগ্যকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেন তিনি। তারপর অদ্যাবধি পর্যন্ত ঘরোয়া ক্রিকেটে রানের বন্যা বইয়ে দিলেও নির্বাচকরা তাকে মূল দলে সুযোগ দিচ্ছেন না।

অথচ বাশারের পর নাফিজকেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যত অধিনায়ক হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বিশ্বকাপে কয়েকটা ম্যাচ ব্যর্থতার পর হিসাব পাল্টে ফেলেন নির্বাচকরা। আজ এসব ইতিহাস হলেও ক্রিকেটার নাফিজ অনাসায়েই খেলতে পারতেন জাতীয় দলে। কিন্তু নির্বাচকদের কারনে সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

ঘরোয়া লীগে ধারাবাহিক রান করাই যদি জাতীয় দলে আসার মাধ্যম হয়, এখানেও চূড়ান্ত ভাবে সফল নাফিজ। তবুও জায়গা হচ্ছে না তার।

রান করে নয়, নির্বাচকদের মন গললেই দলে জায়গা পাবেন নাফিজ, নির্বাচকদের দৃষ্টি নাফিজের দিকে পড়বে, এই কামনা।

জুবায়ের আহমেদ
ক্রীড়া লেখক