মুকুল মির্জা; ক্রিকবল: কোচ হিসেবে ফুটবলে বিপ্লব ঘটাতে পেরেছেন যেই কয়েকজন তাদের মধ্যে মার্সেলো বিয়েলসা অন্যতম এবং এই তালিকার উপরের দিকেই থাকবে মার্সেলো বিয়েলসার নামটা। ১৯৯০ সালে নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের কোচ হিসেবে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করার পর বিয়েলসা আটলাস, ভেলেজ, এস্পানিওল, আর্জেন্টিনা, চিলি, আতলেটিকো বিলবাও, অলিম্পিক মার্শেই, লাজিও, লিলে এবং লিডসের কোচ হন!!

ক্লাব কোচিং ক্যারিয়ার মার্সেলো বিয়েলসার কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনাঃ ২০১১/১২ মৌসুমে বিয়েলসার দল আতলেটিকো বিলবাও খেলেছিলো ইউরোপা ফাইনাল এবং কোপা ডেল রে ফাইনাল। কিন্তু দুই ফাইনালে স্পেনের দুই দলের কাছে হেরে যায় বিলবাও। সেই মৌসুমে ওল্ড ট্রাফোর্ডে গিয়ে বিয়েলসার দল ৩-২ গোলে হারিয়েছিলো আলেক্স ফার্গুসনের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে।

স্পেন ছেড়ে বিয়েলসা যান ফ্রান্সে। সেখানে, বিয়েলসা ফ্রাঞ্চ ক্লাব মার্সেই-র কোচ হিসেবে ছিলেন প্রায় ১২ মাস। রেলিগেশনের শংকায় ধুকতে থাকা মার্শেইকে লিগে চতুর্থ বানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরের মৌসুমে কায়ানের সাথে ১-০ গোলে হারার কারণে নিজের উপর আক্ষেপ করে দ্বায়িত্ব ছেড়ে দেন পাগলাটে বিয়েলসা।বিয়েলসা চলে যাওয়ার পর মার্শেই প্রেসিডেন্ট আক্ষেপ নিয়ে বলেছিলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছিলো আমরা ১২ মাসের জন্য লিওনেল মেসিকে সাইন করিয়েছিলাম।” মার্সেই-এর পর বিয়েলসা যোগ দেব লাজিওতে আর সেখানে ছিলেন মাত্র ৩ দিন,এরপর যোগ দেন লিলেতে কিন্তু সেখানে বেশি দিন থাকেননি, কোচিং করিয়েছিলেন মাত্র ১৩ ম্যাচ!!

বিয়েলসা কোচ হিসেবে সবচেয়ে বড় বাজিমাতটা করেছেন লিডস ইউনাইটেডের হয়ে। তিনবার ইংল্যান্ড সেরা হওয়া লিডস ২০০৩/০৪ এর পর দীর্ঘ ১৪ বছরে ১১ জন কোচ পরিবর্তন করে প্রিমিয়ার লিগে জায়গা করে নিতে পারছিলো না। সেই লিডসকে মাত্র ২ বছরের মাঝেই প্রিমিয়ার লিগে প্রমোট করেন বিয়েলসা।প্রিমিয়ার লিগে প্রমোট করার করার পর অসাধারণ এটাকিং ফুটবল খেলিয়ে সবার প্রশংসা পান বিয়েলসা এবং টেবিলের ৯ নম্বর পজিশনে থেকে মৌসুম শেষ করেন!!

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে বিয়েলসাঃ

মার্সেলো বিয়েলসা আর্জেন্টিনার কোচ হিসেবে নিযুক্ত হন ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর।ড্যানিয়েল প্যাসারেল্লার জায়গায় তিনি আর্জেন্টিনার ডাগ-আউটে আসেন।২০০২ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আর্জেন্টিনা ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। মাত্র ১ ম্যাচ হেরে পয়েন্ট তুলে নিয়েছিল সর্বোচ্চ ৪৩।কিন্তু হট ফেভারিট হয়েও ২০০২ বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বের ৩ ম্যাচের মাত্র ২ গোল করে গ্রুপপর্বে বাদ পড়ে আর্জেন্টিনা। ২০০৪ কোপা আমেরিকাতেও একই পরিণতি। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষ হওয়ার ২০ সেকেন্ড আগে আদ্রিয়ানোর গোলে ২-২ সমতায় ফেরা ব্রাজিল পরবর্তীতে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফাইনাল জিতে নেয় টাইব্রেকারে।তবে বিয়েলসার হাত ধরেই আর্জেন্টিনা জয় করে তাদের প্রথম অলিম্পিক গোল্ড মেডেল। ১৯২৮ সালে উরুগুয়ের পর প্রথম লাতিন আমেরিকা দল হিসেবে ফুটবলে গোল্ড মেডেল গলায় ওঠে আর্জেন্টিনার। এমনকি ৬২ বছর পর যেটি কি না আর্জেন্টিনার প্রথম স্বর্ণপদক। অলিম্পিক শেষেই বিয়েলসার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হন পেকারম্যান।

২০০৭-২০১১ সাল পর্যন্ত চিলির কোচ ছিলেন মার্সেলো বিয়েলসা।বিয়েলসার অধীনে ১৯৯৮ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব উতরে মূল আসরে খেলে চিলি।বিয়েলসার হাত ধরেই উঠে আসে ভিদাল-সানচেজ-ব্রাভোদের মত খেলোয়াড়রা।আর এদের নিয়েই টানা দুইটি কোপা আমেরিকা জয় করেন সাম্পাওলি।কোচ হিসেবে ডাগ-আউটে বিয়েলসা না থাকলেও এই ট্রফি জয়ের জন্য বিয়েলসার কাছে ঋণী চিলিবাসিরা!!

কোচ হিসেবে অর্জনের দিক দিয়ে পেপ গার্দিওলা, দিয়াগো সিমিওনে কিংবা পচেত্তিনোর সমপর্যায়ে অথবা ধারেকাছে না থাকলেও এই তিনজন গুরু মানেন এই মানুষটাকে। বার্সেলোনার দায়িত্ব পেয়ে ১১ ঘন্টার ফ্লাইটে বিয়েলসার সাথে আলোচনা করতে আর্জেন্টিনায় ছুটে যান গার্দিওলা। যে আলোচনা শেষে গার্দিওলা বলেছিলেন,” বিয়েলসা বার্সেলোনা নিয়ে যা জানেন, আমি কোচ হয়েও তা জানি না।” রিয়াল মাদ্রিদের দায়িত্ব পেয়ে জিদান মার্শেইতে গিয়ে তার সান্নিধ্যে সময় কাটান তিন ঘন্টা।

বিয়েলসার ফুটবল নিয়ে পাগলামীতে সাংবাদিকরা একবার বিলবাও খেলোয়াড় ইকার মুনিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “বিয়েলসা কি সবসময় এমন পাগল?” মুনিয়ান হেসে জবাব দিয়েছিলো, “তিনি এর চেয়েও বেশি পাগল।”

বিয়েলসাদের মত পাগলাটে টাইপের লোকদের কারণেই ফুটবল এত সুন্দর।যুগে যুগে ফুটবল আমাদের উপহার দিক বিয়েলসাদের।